জসিম উদ্দিন টিপু,টেকনাফ :
টেকনাফের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্টান হ্নীলা আল জামেয়া দারুস সুন্নাহ মাদরাসার শুরা কমিটি তথা পরিচালনা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবছার উদ্দিন চৌধুরী পছন্দের লোকদের দিয়ে ইচ্ছামত শুরা কমিটি গঠন করেছেন। তাদের অভিযোগ, মৌলভী আবছার উদ্দিন চৌধুরী হইতোবা, কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে শুরা কমিটি অনুমোদন নিয়েছেন। আদৌ সেই সময়ে অনুমোদন নিয়েছেন কিনা? তা নিয়েও তাদের যথেষ্ট সন্দেহ এবং সংশয় রয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর মতে, অনুগত এবং পছন্দের লোকদের দ্বারা গঠিত হ্নীলা মাদরাসার বর্তমান শুরা কমিটি। তাই সহজে মৌলভী আবছার উদ্দিন শুরার বেশিরভাগ সদস্যদের অন্ধকারে রেখে নিজের ইচ্ছামত বছরের পর বছর ঐতিহ্যবাহী এই মাদরাসাটি পরিচালনা করে আসছেন বলে তাদের অভিযোগ। মুহতামিম নিজ বলয়ের লোকদের দিয়ে প্রতিষ্টানের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করায় আগেকার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান প্রক্রিয়া তেমন পরিলক্ষিত হয় না বলে এখানকার অভিভাবকদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদরাসার অনেক শিক্ষক জানান,জামেয়ায় চলছে শুধু মুহতামিমের রাজত্ব! যেন মুহতামিম সাহেব নিজেই মাইক এবং ব্যাটারি! সবকিছু নিজের মধ্যে রেখেই মাদরাসা চালাচ্ছেন তিনি। হুজুরদের অনেকে বলেছেন,মুহতামিম সাহেব মাদরাসায় এক ধরণের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
নিজের অপছন্দের শিক্ষকদের উপর তিনি রীতিমত স্টিম রোলার চালিয়ে মাদরাসা ছাড়া করেন। সিনিয়র এবং ভালো মানের শিক্ষকদের নানা ভাবে হেনস্তা ও অসম্মানিত করা মৌলভী আবছারের স্বভবজাত চরিত্র বলেও ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানিয়েছেন।
এদিকে বর্তমান শুরা কমিটি পুনর্গঠন এবং সংস্কার করা না হলে যেকোন মুহুর্তে আবারো হ্নীলা আল জামেয়া দারুস সুন্নাহ মাদরাসা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী এবং সচেতন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে মাদরাসার আশেপাশের গ্রামের আলেম সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত করে দ্রুত সময়ে হ্নীলা মাদরাসার শুরা কমিটি পূর্ণগঠন এবং সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন হ্নীলা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জামেয়া দারুস সুন্নাহ মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্র অধ্যাপক জহির আহমদ।
সম্প্রাতিক সময়ে হ্নীলা-টেকনাফ জুড়ে দারুস সুন্নাহ মাদরাসার শুরা কমিটি এবং গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ জোরে শুরে আলোচনা সমালোচনা চলছে। সর্বস্তরের এলাকাবাসী এবং জামেয়ার প্রাক্তণ ছাত্ররা দ্রুত সময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে গঠিত বর্তমান শুরা পুর্নগঠনসহ পূর্ণ সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। মাদরাসার স্বার্থে উত্থাপিত ন্যায্য দাবি মেনে না নিলে মুহতামিমকে অপসারণসহ এলাকাবাসী বৃহত্তর কর্মসূচী ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন।
গত শনিবার ( ১৯অক্টোবর) অনুষ্ঠিত শুরা কমিটির বৈঠক অনুষ্টিত হয়। এসময় স্থানীয় এলাকাবাসী এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা শুরা কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন। এসময় ইত্তেহাদুল মদারিসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও মাদরাসার অন্যতম শুরা সদস্য আল্লামা ওবায়দুল্লাহ হামযার সাথে প্রতিনিধিদল আলাপ আলোচনা করেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং এলাকাবাসীর প্রতিনিধি আল্লামা ওবায়দুল্লাহ হামযার কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পেশ করেন। তিনি উত্থাপিত প্রস্তাবনা শুনেন এবং তা বাস্তবায়নের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে,কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মদারিসের গঠনতন্ত্রের ৯নং ধারা মতে মজলিসে শুরা গঠন করা হয়। গঠনতন্ত্র মতে সংশ্লিষ্ট মাদরাসা নিকটবর্তী কাওমী মাদরাসা সমুহের মুহতামিমগণ এবং স্থানীয় আদর্শ, সুন্নাতের পাবন্দ, বিদআতমুক্ত ও মাদরাসার হিতাকাংখী ওলামাদের মধ্য থেকে শুরার সদস্য মনোনয়ন করা হবে। বিশেষ পরিস্থিতিরি কারণে স্বল্প সংখ্যক গাইরে আলেম সদস্য নেওয়া যাবে। আঞ্জুমানের সাধারণ সম্পাদকের মনোনয়ন ও সুপারিশে আঞ্জুমানের সভাপতি আঞ্জুমানভুক্ত মাদরাসা সমূহের মজলিসে শুরার অনুমোদন দান করবেন বলে বিধানে স্পষ্ট উল্লেখিত আছে। মাদরাসার সবকিছু পরিচালিত হবে শুরা কমিটির নেতৃত্বে। আঞ্জুমানের প্রণীত বিধান মতে, মজলিসে শুরা একটি স্থায়ী মজলিস। শুরা কমিটি গঠন এবং পূর্ণগঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আঞ্জুমানের এখতিয়ার। শুরা কমিটির সদস্য রাখার ক্ষেত্রে মাদরাসার মান অনুসারে ১১ থেকে সর্বোচ্চ ২৫জন রাখা যাবে বলে কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের বিধান পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ আছে। শুরা কমিটি গঠন পুর্ণগঠন ও সংস্কারে আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মদারিসের বিধান মতে করতে পারবেন একমাত্র বোর্ড। কিন্তু হ্নীলা মাদরাসায় গঠিত শুরা
এলাকাবাসীর দাবী,কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রদত্ত বিধান মতে হ্নীলা মাদরাসার শুরা কমিটি গঠন করা হয়নি। এখানে মুহতামিম নিজের ইচ্ছামতো পছন্দের লোকদের শুরা কমিটিতে অর্ন্তভুন্ত করেছেন।
হ্নীলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও অভিভাবক বাহাদুর শাহ তপু ক্ষোভের সাথে জানান,শুরা কমিটি এটি আবছার সাহেবের ব্যক্তিগত কমিটি। তিনি উক্ত শুরা কমিটিকে পকেট কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও মাদরাসা প্রতিষ্টার পর থেকে তাদের পরিবার এবং নিকটজন বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা দিয়ে আসছে বলে তিনি দাবি করেন।
পছন্দ এবং নিজের অনুগত লোকদের নিয়ে শুরা কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে মাদরাসার মুহতামিম ও শুরা কমিটির সদস্য সচিব (সাধারণ সম্পাদক) মাওলানা আবছার উদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
হ্নীলা মাদরাসার শোরা কমিটি পুর্ণগঠন ও সংস্কারসহ যাবতীয় বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আল্লামা ওবায়দুল্লাহ হামযা এ প্রতিবেদককে বলেন,কওমী মাদরাসা টোটালি জনগণের মাদরাসা। স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্বীনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে এবং অনন্তকাল থাকবে জানিয়ে তিনি আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মদারিস তথা কওমী শিক্ষা বোর্ডের বিধান এবং শুরায় আলাপ আলেচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।